Historic Initiative in Rare Disease Screening in Kolkata.


কলকাতায় বিরল রোগ স্ক্রিনিংয়ে ঐতিহাসিক উদ্যোগ! ১১ হাজার ৩০০ পরিবারে পরীক্ষা, ১১টি রোগ নির্ণয়

কলকাতা পুরসভা, ORDI ও RWBA-র উদ্যোগে প্রথম সরকারি বিরল রোগ স্ক্রিনিং কর্মসূচিতে ১১,৩০০ পরিবার পরীক্ষা, ১১টি নিশ্চিত রোগ নির্ণয় এবং সুস্থ শিশুজন্মের নজির।

কলকাতায় বিরল রোগ স্ক্রিনিংয়ে ঐতিহাসিক উদ্যোগ! ১১ হাজার ৩০০ পরিবারে পরীক্ষা, ১১টি রোগ নির্ণয়

প্রেস ক্লাবে সচেতনতা অনুষ্ঠান।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: 27 February 2026 18:41

দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনার সেই স্তব্ধ সময়টা মনে আছে? শহর থমকে ছিল, রাস্তা ফাঁকা, হাসপাতাল সতর্ক, আর মানুষ ভেতরে ভেতরে ভীত। কিন্তু সেই অদ্ভুত সময়ই কলকাতার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একটা নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—বিরল জিনগত রোগ কি আমরা যথাসময়ে ধরতে পারছি?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় এক অভিনব উদ্যোগ—‘কল্যাণ নিরূপম যোজনা’। কলকাতা পুরসভা (KMC), অর্গানাইজেশন ফর রেয়ার ডিজিজেস ইন্ডিয়া (ORDI) এবং রেয়ার ওয়ারিয়র্স অফ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন (RWBA)-এর যৌথ প্রয়াসে চালু হয় দেশের প্রথম সরকারি উদ্যোগে প্রশ্নমালাভিত্তিক বিরল রোগ স্ক্রিনিং কর্মসূচি।

আরও পড়ুন

ফুসফুসে ফিসচুলা! কাটাছেঁড়া ছাড়াই বিরল রোগের চিকিৎসা কলকাতার হাসপাতালে, সুস্থ হলেন বৃদ্ধা

ফুসফুসে ফিসচুলা! কাটাছেঁড়া ছাড়াই বিরল রোগের চিকিৎসা কলকাতার হাসপাতালে, সুস্থ হলেন বৃদ্ধা

কিডনির জন্য ডিভোর্স! দ্বিতীয় স্ত্রীর অঙ্গ নিয়ে ফের ফিরলেন প্রথমের কাছে! রোগীর জীবন হার মানাবে সিনেমাকেও

কিডনির জন্য ডিভোর্স! দ্বিতীয় স্ত্রীর অঙ্গ নিয়ে ফের ফিরলেন প্রথমের কাছে! রোগীর জীবন হার মানাবে সিনেমাকেও

 

এটি শুধু আর পাঁচটা স্বাস্থ্য প্রকল্প নয়। এটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরেই জুড়ে দেওয়া হয়েছে—যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন পরিষেবা পান। অর্থাৎ বিরল রোগ নিয়ে সচেতনতা আর চিকিৎসা—দুটোই এখন নাগালের ভেতর।

১১,৩০০ পরিবার স্ক্রিনিং, ৭২ পরিবার উচ্চ ঝুঁকিতে

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কলকাতার ১১ হাজার ৩০০-রও বেশি পরিবার এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় এসেছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রশ্নমালার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ৭২টি পরিবারকে জেনেটিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এদের বিস্তারিত মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয় বিশেষজ্ঞদের কাছে। ফলাফল? এখন পর্যন্ত ১১টি বিরল রোগের নিশ্চিত নির্ণয় হয়েছে। আরও ১৫টি সন্দেহভাজন ঘটনা এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।

কিন্তু সংখ্যার বাইরেও আছে কিছু গল্প। দুটি পরিবার, যাদের আগের সন্তান জন্মগত ত্রুটিতে আক্রান্ত হয়েছিল, তাঁদের সময়মতো জেনেটিক পরামর্শ দেওয়া হয়। সঠিক চিকিৎসা ও নজরদারির ফলে তাঁরা সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। জনস্বাস্থ্যের পরিসংখ্যানে এই ঘটনা শুধু একটি ডেটা নয়—এটি এক একটি পরিবারের স্বস্তির নিঃশ্বাস।

কল্যাণ নিরূপম যোজনা

এদিন প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে ORDI-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ডিরেক্টর শ্রী প্রসন্না শিরোল বলেন, “কল্যাণ নিরূপম যোজনা হল কলকাতা পুরসভার নেতৃত্বে ORDI ও RWBA-র অংশীদারিত্বে একটি মাইলফলক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। এটি দেশের প্রথম সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিরল রোগ স্ক্রিনিং কর্মসূচি, যা প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত। এই উদ্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলিকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, রেফারাল এবং জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ দিচ্ছে। এই মডেল প্রমাণ করে যে বিরল রোগের পরিষেবা কার্যকরভাবে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমেই দেওয়া সম্ভব এবং এটি ভবিষ্যতে জননীতিকে প্রভাবিত করতে পারে ও অন্যান্য রাজ্যেও প্রয়োগযোগ্য।”

রেয়ার ওয়ারিয়র্স অফ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শ্রীমতী শিখা মেহত্রামানি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক প্রকৃত পরিবর্তনকারী হিসেবে উঠে আসছে। দীর্ঘমেয়াদে এই স্ক্রিনিং কর্মসূচি কিছু নির্দিষ্ট বিরল জিনগত রোগের পুনরাবৃত্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে, এমনকি প্রতিরোধ করতেও সক্ষম হতে পারে, যা অসংখ্য পরিবারের কাছে আশার আলো নিয়ে আসবে। কলকাতা পুরসভার এই পাইলট উদ্যোগ বিরল রোগ সম্প্রদায়ের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাড়া-দেওয়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি পুরসভার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।”

মেডিক্যাল জেনেটিসিস্ট ও রাজ্য সমন্বয়ক ডা. দীপাঞ্জনা দত্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বিরল রোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিগত আলোচনা হলেও প্রতিরোধ নিয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। একটি বিরল রোগ নির্ণয়ে বহু বছর লেগে যায়। এই উদ্যোগ মূলত তৃণমূল স্তরে প্রতিরোধে জোর দিচ্ছে, প্রাথমিক হস্তক্ষেপ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে, নির্ণয়ের বিলম্ব কমিয়ে এবং পরিবারগুলিকে সক্রিয়ভাবে কাঠামোবদ্ধ পরিচর্যার আওতায় এনে, যাতে তারা সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়ে অপেক্ষা না করে।”

হাব-অ্যান্ড-স্পোক মডেল

এই কর্মসূচি ‘হাব-অ্যান্ড-স্পোক’ মডেলে চলছে। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের আশাকর্মীরা প্রথম স্তরে কাজ করছেন। তাঁদের পাশে আছেন মেডিক্যাল অফিসার ও প্রশিক্ষিত জেনেটিক কাউন্সেলররা।

২০২৪-২৫ সালে কলকাতা জুড়ে আশাকর্মীদের বড় আকারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিরল রোগের প্রাথমিক লক্ষণ কীভাবে চিহ্নিত করতে হয়—সেই বিষয়ে তাঁদের হাতে-কলমে শেখানো হয়েছে।

এই প্রশিক্ষণে যুক্ত ছিলেন ডা. শমীক ঘোষ, ডা. বর্ণালী ঘোষ, ডা. কৌশিক মণ্ডল, ডা. অসীমায়ন নন্দী এবং ডা. দীপাঞ্জনা দত্ত। মাঠপর্যায়ে সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ সাপোর্ট গ্রুপও চালু করা হয়েছে।

UPHC 29 ও UPHC 139-এ বিশেষ জেনেটিক ক্লিনিকও চালু হয়েছে, যেখানে বিস্তারিত মূল্যায়ন ও জেনেটিক কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই প্রকল্প এখানেই থেমে নেই। সামনে রয়েছে আরও বড় পরিকল্পনা। আশাপ্রশিক্ষণের বিস্তার, নবজাতকের শ্রবণ স্ক্রিনিং এবং বংশগত গ্লুকোমা স্ক্রিনিং অন্তর্ভুক্ত করার কাজ এগোচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ‘কল্যাণ নিরূপম যোজনা’ শুধু একটি স্বাস্থ্য প্রকল্প নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ভাবনার পরিবর্তন। বিরল রোগ মানেই ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়া নয়। সময়মতো চিহ্নিত করা গেলে, সঠিক পরামর্শ দেওয়া গেলে, অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ সম্ভব।

কলকাতা সেই দৃষ্টান্তই স্থাপন করল।

souces:https://www.thewall.in/arogya/rare-disease-screening-kalyan-nirupam-yojna-kolkata-public-sector/tid/188044

Spread the love